;

আজ পবিত্র শবে বরাত: বরকতময় রজনীর আহ্বান

আজ পবিত্র শবে বরাত: বরকতময় রজনীর আহ্বান

ছবি সংগৃহীত

আজ দিবাগত রাত পবিত্র শবে বরাত। ইসলামি চান্দ্রবর্ষের শাবান মাসের ১৪ তারিখ মধ্যরাতে পালিত এই বিশেষ রজনী মুসলিম উম্মাহর কাছে গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য বহন করে। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ রাতে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও ক্ষমা প্রার্থনার আশায় ইবাদত-বন্দেগিতে সময় অতিবাহিত করেন।

‘শবে বরাত’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ভাগ্য বা মুক্তির রাত। ইসলামি পরিভাষায় এই রাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’, অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত। বহু আলেমের মতে, এ রাতে বান্দাদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হয়।

হাদিসের আলোকে শবে বরাতের গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিভিন্ন হাদিসে এই রাতের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, নবী করিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা মধ্য-শাবানের রাতে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন, যা বনু কালব গোত্রের ভেড়ার পশমের সংখ্যার চেয়েও বেশি। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৮৯)

আরেকটি হাদিসে হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং শিরকে লিপ্ত ব্যক্তি ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৯০)

বর্জনীয় প্রথা ও সামাজিক বাস্তবতা

শবে বরাতের ধর্মীয় মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও সমাজে কিছু সংস্কৃতি প্রচলিত রয়েছে, যা ইসলামের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এই রাতকে উৎসবমুখর আয়োজনে রূপ দেওয়া হয়, যা ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে।

বিশেষ করে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো অপচয় হিসেবে বিবেচিত এবং এটি ধর্মীয় পরিবেশ বিঘ্নিত করে। একইভাবে অতিরিক্ত আলোকসজ্জা ও বাহুল্যপূর্ণ আয়োজন অনেক আলেম অপব্যয় হিসেবে মনে করেন।

এ ছাড়া দলবেঁধে রাস্তায় ঘোরাঘুরি বা উচ্চস্বরে হৈচৈ করা এই রাতের গাম্ভীর্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অনেক জায়গায় শবে বরাতকে কেন্দ্র করে হালুয়া-রুটির আয়োজন করা হয়। যদিও এটি সামাজিক ঐতিহ্যের অংশ, তবে এটিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা মনে করা ঠিক নয়।

ইবাদতের মাধ্যমে আত্মিক উন্নয়ন

শবে বরাত মূলত ইবাদত ও আত্মসমালোচনার রাত। এ রাতে মুসলমানরা নফল নামাজ আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন।

এ ছাড়া দান-সদকা করার মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত। অনেকেই প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনদের জন্য দোয়া করতে কবর জিয়ারত করেন, যা মানুষকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং পরকালীন জীবনের প্রস্তুতির অনুপ্রেরণা জোগায়।

তওবা ও হৃদয়ের পবিত্রতার শিক্ষা

এই পবিত্র রজনী মুসলমানদের জন্য আত্মশুদ্ধির বিশেষ সুযোগ নিয়ে আসে। হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার থেকে মুক্ত হয়ে পারস্পরিক সম্প্রীতি গড়ে তোলার শিক্ষা দেয় শবে বরাত। বর্তমান বিশ্বে যখন বিভাজন ও অস্থিরতা বাড়ছে, তখন এই রাত মানুষকে সহমর্মিতা ও মানবিকতার পথে আহ্বান জানায়।

পবিত্র এই রাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের অন্তরকে পবিত্র করাই ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে নতুনভাবে জীবন গড়ার প্রত্যয় নেওয়াই হতে পারে শবে বরাতের প্রকৃত শিক্ষা।

এই বরকতময় রজনীর আলো সবার জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও ঐক্যের বার্তা বয়ে আনুক—এটাই সকলের প্রত্যাশা।